আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা

Loading

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস

 

 

ভূমিকা: বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তার অধীনে নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত বিভিন্ন কমিশন নানা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে। বিশেষ করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবী জানিয়েছে দেশের অধিকংশ রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। নির্বাচনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ভোটারদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশের মাটিতে আর যেন কোনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার আসতে না পারে সেজন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি চালু করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। যদি রাজনৈতিক দলসমূহ একমত হয়, তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক বা পিআর পদ্ধতিতে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরোপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কেননা ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে চালু হওয়া পিআর পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে ৯১টি, অর্থাৎ ৫৪% দেশে পিআর ভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উন্নত দেশের সংগঠন ওইসিডি’র ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৭০% দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

 

যোগ্য নেতৃত্ব সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার

——

নির্বাচন বিশ্লেষকগণ বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচনের এই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক পিআর পদ্ধতি যদি চালু হয় তাহলে তা সুশাসন নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’ নির্বাচন বিশ্লেষকগণ আরো বলছেন, এ পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রত্যেকটি ভোট কাজে লাগে এবং প্রতিটি ভোট সংসদে সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তাছাড়া একটি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ও হারের ভিত্তিতে সংসদে আসন বণ্টন হয়। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতি চালু হলে সবার জন্য ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে, প্রতিটি ভোট কার্যকর হবে, জোট ও সমঝোতার মাধ্যমে বিভাজন কমবে এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান ও স্থিতিশীলতা তৈরি হবে। একইসঙ্গে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠবে, সুষ্ঠ নির্বাচন ও স্বচ্ছতা বাড়বে। দুর্নীতি ও কালো টাকার প্রভাব হ্রাস পাবে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত হবে। এ প্রবন্ধে গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রচলিত প্রধান কয়েকটি নির্বাচন পদ্ধতি, বাংলাদেশে প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, আগামী নির্বাচনে পিআর পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা এবং সম্প্রতি পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে যে সমালোচনা করা হচ্ছে তার জবাব দেওয়া হয়েছে।

 

 

বিশ্বে প্রচলিত প্রধান কয়েকটি নির্বাচন পদ্ধতি: গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নির্বাচন পদ্ধতি বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। তবে সাধারণভাবে নিচের প্রধান কয়েকটি নির্বাচন পদ্ধতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।

 

 

১। First Past-the-Post (FPTP) পদ্ধতি: সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রচলিত First Past-the-Post (FPTP) বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতি হলো একটি সাধারণ এবং বহুল প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী আসনে যিনি সর্বাধিক ভোট পান, তিনিই বিজয়ী হন। এখানে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রাপ্ত ভোটের নির্দিষ্ট কোনো অনুপাত (threshold) অর্জন করতে হয় না। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একাধিক প্রার্থীর মধ্যে যে প্রার্থী বেশি ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন।’

 

ধরা যাক, কোন নির্বাচনী এলাকায় মোট ভোটার ১০০০ জন এবং উক্ত এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন ক, খ ও গ তিনজন। নির্বাচনে ক পেলেন ৪০০ ভোট (মোট ভোটের ৪০%), খ পেলেন ৩৫০ ভোট (মোট ভোটের ৩৫%) এবং গ পেলেন ২৫০ ভোট (মোট ভোটের ২৫%)। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়ার কারণে ক প্রার্থী বিজয়ী হবেন, যদিও ৬০% ভোটার তাকে সমর্থন করেননি। এ পদ্ধতিতে ভোটের নিরিখে দলের চেয়ে ব্যক্তির প্রাধান্য বেশি প্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে।

——

 ২। (Proportional Representation-PR) আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতি: প্রোপোরশনাল

রিপ্রেজেন্টেশন বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন পদ্ধতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে একটি রাজনৈতিক দলের সংসদীয় আসন সংখ্যা সরাসরি তাদের মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নির্ধারিত হয়। এ পদ্ধতি মূলত দলভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয় এবং সমগ্র দেশ একক ইউনিট হিসেবে ধরে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন বিন্যাস করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ পদ্ধতিতে ব্যক্তির পরিবর্তে দল প্রাধান্য পায়। দলের ইশতেহার, জনগণের নিকট দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দলের অতীত কার্যক্রম বিবেচনা করে ভোটাররা ভোট প্রদান করে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে আসন লাভ করে।”

 

ধরা যাক, কোন দেশে ১০০টি আসন এবং মোট ভোটার সংখ্যা ১০০০। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ক, খ ও গ দল নির্বাচন প্রতিযোগিতা করছে। ক দল যদি ৪০০ ভোট পায় তাহলে মোট ভোটের অনুপাতে ৪০ আসন পাবে। আর খ দল যদি ৩৫০ ভোট পায় তবে মোট ভোটের অনুপাতে ৩৫ আসন পাবে এবং গ দল যদি ২৫০ ভোট পায় তবে মোট ভোটের অনুপাতে ২৫ আসন পাবে। এই পদ্ধতিতে সকল ভোটারেরই ভোটের মূল্যায়ণ হয়। এই পদ্ধতিতে ভোটাররা সাধারণত দলকে ভোট দেন। নির্বাচনের আগে প্রতিটি দল প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে। মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন লাভ করে এবং প্রকাশিত প্রার্থীদের তালিকা হতে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।”

 

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতির ধরণ: আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতির বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী তিন ধরনের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়।

 

(ক) দলের প্রদত্ত তালিকা (Party List PR System): আনুপাতিক পদ্ধতির এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির একটি। ভোটারদের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে সংসদীয় আসন লাভ করে। এ পদ্ধতিতে দেশ বা অঞ্চলকে এক বা একাধিক নির্বাচনী এলাকায় (Constituency) বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি দল একটি প্রার্থী তালিকা (Candidate list) জমা দেয়। এ পদ্ধতিতে ভোটাররা ব্যক্তি বা প্রার্থীকে নয়, বরং দলকে ভোট প্রদান করে থাকে। এরপর প্রতিটি দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায় এবং প্রদত্ত তালিকা থেকে প্রার্থী নির্বাচিত করে সংসদে পাঠায়। এভাবে প্রতিটি এলাকায় অধিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। এ পদ্ধতিতে দুই ধরণের তালিকা পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়:

 

বন্ধ তালিকা পদ্ধতি (Closed List System): এ পদ্ধতিতে দল প্রার্থীদের একটি তালিকা করেন এবং এ তালিকা নির্বাচন কমিশনকে জমা দেন। ভোটাররা শুধুমাত্র দলকে ভোট দেন। প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ঐ দল সংসদে তাদের তালিকা হতে প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এই পদ্ধতিতে কে সংসদে যাবেন তা দল নির্ধারণ করে। স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও তুরস্কে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তবে সংসদে কোন দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য মোট ভোটের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা অংকের (Threshold) ভোট পেতে হয়। যেমন- তুরস্কে মোট ভোটের ৭% ভোট পেতে হয়। এই Threshold বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলের ও জনগণের অংশগ্রহণ ও আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

 

উন্মুক্ত তালিকা পদ্ধতি (Open List System): এ পদ্ধতিতে দল প্রার্থীদের একটি তালিকা করেন এবং ভোটাররা দলের পাশাপাশি তাদের পছন্দের প্রার্থীকেও ভোট দিতে পারেন। এতে ভোটারের মতামত প্রার্থী নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। এই পদ্ধতি দেশের ছোট দল, সংখ্যালঘু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সংসদে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং একচেটিয়া ক্ষমতা খর্ব করে। সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে।

 

(গ) মিশ্র সদস্য আনুপাতিক পদ্ধতি (Mixed Member PR System): মিশ্র সদস্য আনুপাতিক পদ্ধতি একটি

ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ভোটাররা দুইটি ভোট প্রদান করে থাকেন। একটি ভোট দলকে আনুপাতিক (PR) পদ্ধতিতে এবং আরেকটি ভোট এলাকার পছন্দের প্রার্থীকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার (FPTP) ভিত্তিতে প্রদান করে থাকেন। এই ব্যবস্থায় সংখ্যানুপাতে সংসদে দলীয় আসন বণ্টন করা হয় এবং যদি কোন দল সরাসরি ভোটে (FPTP) কম আসন পায় তাহলে আনুপাতিক (PR) পদ্ধতিতে দলীয় মোট ভোটের অনুপাতে আসন সংখ্যা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সমন্বয় করা হয়। এতে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং অন্য দিকে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অনুযায়ী সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। জার্মানি ও নিউজিল্যান্ডে এই মিশ্র পদ্ধতি প্রচলিত আছে।

——

 (ঘ) সেমি পিআর বা প্যারালাল নির্বাচন পদ্ধতি: এই পদ্ধতি মিশ্র সদস্য অনুপাতিক (Mixed Member PR

System) পদ্ধতির মতোই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি যেখানে দুই ভাগে আসন নির্ধারিত হয়। একভাগে ভোটাররা এলাকার পছন্দের প্রার্থীকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার (FPTP) ভিত্তিতে ও অন্য ভাগে দলকে আনুপাতিক (PR) পদ্ধতিতে নির্বাচিত করে। কিন্তু সেমি পিআর পদ্ধতিতে মিশ্র পিআর পদ্ধতির মতো অনুপাত সামঞ্জস্যতা বিধান করে না, কিন্তু পৃথকভাবে আসন যোগ করে। জাপান, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে।

 

৩। Single Transferable Vote (STV) বা একক স্থানান্তরিত ভোট পদ্ধতি: এটি একটি আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ভোটারগণ বহু প্রার্থী হতে পছন্দ করে (১, ২, ৩ র‍্যাঙ্কিং করে) একাধিক প্রার্থীকে ভোট প্রদান করে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য একাধিক আসন নির্ধারিত থাকে। নির্বাচনের সময় ভোটাররা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ক্রম অনুযায়ী পছন্দের তালিকা (Preference Rank) করে ভোট প্রদান করে।

 

ধরা যাক, নির্বাচনে ক, খ ও গ প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে। STV পদ্ধতিতে ভোটাররা প্রথম পছন্দ হিসেবে ক, দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে খ এবং তৃতীয় পছন্দ হিসেবে গ কে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিজয়ী প্রার্থী নির্ধারণে একটি কোটা (Quota) নির্ধারিত থাকে। যেসব প্রার্থী প্রথম পছন্দে কোটা পূর্ণ করেন, তারা সরাসরি নির্বাচিত হন। আর কোটার অতিরিক্ত (Surplus) ভোটগুলো ভোটারদের পরবর্তী পছন্দের প্রার্থীর মধ্যে স্থানান্তর করা হয়। যদি কোন প্রার্থী কোটা পূরণ না করে তবে তার ভোট পরবর্তী প্রার্থীর নিকট স্থানান্তরিত হয়। তবে সর্বনিম্ন ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থী বাদ পড়ে এবং তার ভোটগুলো অন্য প্রার্থী পায়। এভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এ পদ্ধতিতে ভোটের অপচয় কম হয়, পছন্দনীয় প্রার্থী বিজয়ী না হলেও তা অন্য প্রার্থীর জন্য কার্যকর হয় এবং ব্যক্তি ও দলের প্রতি ভোটারের মতামত প্রতিফলিত হয়। আয়ারল্যান্ড, মাল্টা, অস্ট্রেলিয়ার সিনেট নির্বাচন এই প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।’

 

৪. জাতীয় বা আঞ্চলিক আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে সমস্ত দেশকে একটি নির্বাচনী আসন হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ভোটারগণ শুধু দলকে ভোট প্রদান করেন। প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে দলগুলোকে সমস্ত দেশের জন্য সংসদীয় আসন বণ্টন করা হয়। যেমন- সমস্ত ইসরাইল একটি নির্বাচনী এলাকা এবং ১২০ সংসদীয় আসন দলীয় ভোটে নির্ধারিত হয়। আর নেদারল্যান্ডস সরাসরি জাতীয় তালিকা থেকে আসন নির্ধারণ করে। আবার দেশকে কয়েকটি অঞ্চলে বা প্রদেশে ভাগ (বিভাগ/জেলা) করা হয়। প্রতিটি অঞ্চলে আনুপাতিক হারে আসন বণ্ঠন করা হয় এবং ব্যক্তির পরিবর্তে দলীয় ভোট হয়। ভোটাররা যে অঞ্চলে ভোট প্রদান করেন সে অঞ্চলে আনুপাতিক হারে দলীয় আসন নির্ধারিত হয়। যেমন বেলজিয়ামে অঞ্চল ভিত্তিক ভাষা সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দল অনুয়ায়ী পিআর নির্বাচন হয়। সুইডেনে প্রতিটি কাউন্টি বা অঞ্চল এক একটি পিআর জোন এবং আর্জেন্টিনায় প্রদেশ ভিত্তিক পিআর তালিকায় ভোট অনুষ্ঠিত হয়।”

বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা

 

বাংলাদেশে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনআস্থা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, ভোট কারচুপি, সব দলের সমান অংশগ্রহণের সুযোগের অভাব, বিরোধীদলের অংশগ্রহণহীনতা, পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবে এ দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান মুশকিল হয়ে পড়ে। এছাড়া একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ফলে অধিকাংশ প্রার্থী অল্প কিছু ব্যবধানে বিজয়ী হয় এবং একটি দল সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, ফলে সংসদে অধিকাংশ জনগণের ভোট ও মতামত প্রতিফলিত হয় না। এই পদ্ধতি দলীয় আধিপত্য ও স্বৈরাচারী ধারা প্রতিষ্ঠা করে। উল্লেখ্য যে, বিগত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন একটি বিশেষ দল ব্যাপক ভোট কারচুপি, দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন করা এবং ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ছিল। এর ফলে সংসদ হয়ে উঠেছিল দলের পছন্দের নীতি নির্ধারণের হাতিয়ার যা ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থে আইন প্রণয়ন ও সংবিধান পরিবর্তন করেছিল।

 

 

বাংলাদেশে কোটা বৈষম্য, ভোটারবিহীন নির্বাচন, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদির ফলে জনগণের মাঝে দেখা দেয়া ক্ষোভ থেকে সংগঠিত হয় জুলাই বিপ্লব। এই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ধারা ও সংস্কৃতি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যাপকতা লাভ করেছে। সুযোগ এসেছে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যেখানে গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করতে আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়াকে অধিকতর প্রতিনিধিত্বমূলক, জনগণের অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিতামূলক করে ঢেলে সাজানোর।

——

বাংলাদেশে প্রচলিত (FPTP) নির্বাচন পদ্ধতির অসুবিধা: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতে সংসদীয় গণতন্ত্রে একক

সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতি (FPTP) প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে জনগণের প্রকৃত মতামত ও অংশগ্রহণ প্রতিফলিত হয় না। ভোট কারচুপি, দিনের ভোট রাতে করা, কেন্দ্র দখল, সহিংসতা, অর্থ ও পেশিশক্তি দ্বারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়। এছাড়াও এই পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রার্থী বিজয়ী হলেও অধিকাংশ জনগণের মতামত গুরুত্ব পায় না।”

বিগত ৪ টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলগত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ভোটের ৩০.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪০ টি সংসদীয় আসন পায় যা ৩০০ আসনের বিপরীতে প্রায় ৪৭ শতাংশ সংসদীয় আসন। অর্থ্যাৎ প্রকৃত প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ৪৮ টি আসন বেশি পায়। এভাবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট ৩৭.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৪৬ টি আসন পায় যা প্রাপ্ত প্রকৃত ভোট অনুপাতে ৩৪ টি আসন বেশি পায়।

 

 

আর ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচন পদ্ধতি এই সমস্যাকে আরো প্রকট করে, যেখানে কাছাকাছি ভোট পেয়েও দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও জোট প্রাপ্ত আসনের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষ্যমের শিকার হয়। যেমন ২০০১ সালে ৪ দলীয় জোট মোট ৪৬.৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১৩ টি সংসদীয় আসন পায় যা মোট আসনের ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ৭৪ টি আসন বেশি পায় ৪ দলীয় জোট। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ৪০.০২ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৬২ টি আসন পায় যা মোট আসনের ২১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ৫৮ টি আসন কম পায় আওয়ামী লীগ।

 

 

একইভাবে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী মহাজোট ৫৬.৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৬৩ টি আসন পায় যা মোট আসনের ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রকৃত প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আওয়ামী লীগ ৯৪ টি আসন বেশি পায়। আর ৪ দলীয় জোট ৩৭.৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩৩ টি আসন পায়, যা মোট আসনের ১১ শতাংশ মাত্র। অর্থাৎ প্রকৃত প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ৪ দলীয় জোট ৮০ টি আসন কম পায়।” মোট কথা বাংলাদেশে প্রচলিত একক সংখ্যাগরিষ্ঠ বা FPTP পদ্ধতি সহজ হলেও কার্যকর, জবাবদিহিতামূলক সরকার গঠনের অন্তরায়। এটি সব জনগণের ইচ্ছার যথাযথ প্রতিফলন ঘটায় না। এজন্য অনেক গণতান্ত্রিক দেশ এই পদ্ধতির সঙ্গে অন্যান্য পদ্ধতির সংমিশ্রণ বা সংস্কারের পথে হাঁটছে।

 

 

আনুপাতিক নির্বাচন (পিআর) পদ্ধতি ও আগামীর বাংলাদেশ: এই সমস্যা নিরসনে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের বিকল্প নাই। জনগণের ভোটের ন্যায্য প্রতিফলন, ভোট অপচয়রোধ, স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার বিলোপ, রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদিতা প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করা, নির্বাচনে পেশিশক্তি ও কালোটাকার কারসাজিরোধ, সর্বোপরি জবাবদিহিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকার গঠনে আনুপাতিক পদ্ধতি নির্বাচন প্রয়োজন। সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারী ও সংখ্যালঘু প্রতিনিধি প্রেরণ করতেও এই পদ্ধতি কার্যকর।

বাংলাদেশে বিগত চার দশকে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে একতরফা নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ করেছে বিগত সরকারগুলো। দলীয় নিয়ন্ত্রণ হতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত করে কার্যকরী, গতিশীল, উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন সংস্কার কমিটি কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতির জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও অধিক কার্যকরী সংসদ গঠন করা সম্ভব। যদি বিগত দিনে নির্বাচনগুলো আনুপাতিক পদ্ধতিতে হত তাহলে সংসদকে গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী মনোভাব হতে রক্ষা করা যেতো। সংসদে স্বেচ্ছাচারী আইন প্রণয়ন রোধ ও বারবার অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংবিধান সংশোধন রোধ করা যেতো।

 

 

আনুপাতিক নির্বাচন (পিআর) পদ্ধতির উপকারিতা: (১) পিআর পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি ভোটের মূল্যায়ন হয়, কোন ভোট নষ্ট হয় না, ফলে ভোটারদের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়ে। (২) একদলীয় কর্তৃত্ববাদ খর্ব হয়, স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করা যায়। এতে গণতান্ত্রিক পরিসর সমৃদ্ধ হয়। (৩) নির্বাচনে হানাহানি, কালোটাকার কারসাজি, পেশিশক্তি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ কমে। দল নির্বাচনের ব্যয় বহন করে, ফলে নির্বাচনী ব্যয় হ্রাস পায়। (৪) সংসদে নারী ও সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নিশ্চিত করা যায়, ফলে রাজনৈতিক বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠা পায়। (৫) দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক লোক সংসদে আসার সুযোগ পায়। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হয়, কারণ স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডে সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ হ্রাস পায়। সর্বোপরি জবাবদিহিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকার গঠিত হয়।

—–

 দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ (আইন সভা): দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গণতন্ত্রে একটি সহনশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও গুণগত আইন প্রণয়ন

প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে, যা একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ভারতে লোকসভা ও রাজ্যসভা, যুক্তরাষ্ট্রে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট এবং যুক্তরাজ্যে হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডস ইত্যাদি।১৩

নিম্ন কক্ষ (জনপরিষদ বা প্রতিনিধি পরিষদ): নিম্ন কক্ষে আসন সংখ্যা হবে ৩০০টি। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর)

পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকা ভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নির্বাচনের পরিবর্তে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে এবং দল ৩০০ আসনের জন্য প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে সে দল তত সংখ্যা অনুপাতে সংসদে আসন পাবে।

উচ্চ কক্ষ (জাতীয় পরিষদ): উচ্চ কক্ষের আসন সংখ্যা হবে ১০০ টি। নিম্নকক্ষের আসন অনুপাতে বা দলীয় মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চ কক্ষের আসন বণ্টন করা হবে।

 

 

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনের সমালোচনা ও জবাব: সম্প্রতি একটি মহল বাংলাদেশে প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এককভাবে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজী ও জবর দখলের বাসনায় পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে সমালোচনা করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে, ১। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ পিআর পদ্ধতি বোঝে না। ২। পিআর পদ্ধতি হলো ‘পার্মানেন্ট রেস্টনেস’ বা স্থায়ী অস্থিতিশীল পদ্ধতি। ৩। পিআর পদ্ধতিতে জনগণ ভোট দিবে সন্দ্বীপে আর এমপি হবে মালদ্বীপে। ৪। দলীয় কেন্দ্রীকরণ ঘটবে ফলে যে কোন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ স্বৈরাচারী হবে। ৫। পিআর পদ্ধতিতে চরমপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং নিষিদ্ধঘোষিত দল বা গোষ্ঠীর আবির্ভাব হবে। ৬। পিআর পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ইত্যাদী

সমালোচনা-১ বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ পিআর পদ্ধতি বোঝে না: অনেকে মনে করে থাকেন বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ পিআর পদ্ধতি বোঝে না। এজন্য তারা পিআর পদ্ধতি পছন্দ করবেন না।

———-

জবাব: বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও এখন রাজনৈতিক সচেতন। একটি গ্রামের চা স্টলেও এখন রাজনৈতিক আলাপ হয়। জনগণ জেনে গেছে যে, ‘চলমান একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পদ্ধতিতে সর্বাধিক ভোট পাওয়ার কারণে একজন প্রার্থী নির্বাচিত হয়, অথচ অধিকংশ ভোটার তাকে সমর্থন করে না। অধিকংশ ভোটারের ভোট কোন কাজেই আসে না’ অথচ পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের সব ভোটারের ভোট মূল্যায়ন করা হবে।

 

সমালোচনা-২ দুর্বল ও অস্থিতিশীল সরকার: অনেকে মনে করে থাকেন যে এই পদ্ধতিতে কোন একটি দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে জোট সরকার গঠন করতে হবে। সরকার হবে দূর্বল ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হবে। অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা আসবে কারণ জোটবদ্ধ ছোট ছোট দলগুলোর সাথে দর কষাকষি করতে হবে। জোট ভেঙ্গে গেলে সরকার অস্থিতিশীল হবে।

 

জবাব: এই ব্যবস্থায় একটি সহনশীল ও অংশগ্রহণমূলক সরকার গঠিত হয়। সরকারে দলীয় একক আধিপত্যরোধ হয়, ছোট দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে টেকসই, স্বচ্ছ ও গণমুখি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হয়। ফলে সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিকধারা বিকশিত হয়। যেমন- জার্মানি, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডসে এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসন করছে এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা, শিষ্টাচার, ভিন্ন মতের সহাবস্থান নিশ্চিত করে বিশ্বের বুকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

———————

সমালোচনা-৩ ভোটার ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সম্পর্কের ঘাটতি: এই ব্যবস্থায় ভোটাররা তাদের জনপ্রতিনিধিকে চিনতে জানতে পারবে না। এলাকার জনগণ জানতে পারবে না যে তাদের প্রতিনিধি কে হবেন? তালিকা ভিত্তিক প্রার্থী হওয়ায় প্রার্থীরাও তাদের এলাকায় যেতে অনাগ্রহী হবে। প্রার্থী তালিকা হতে নির্বাচিত হওয়ার বিধান হলে প্রার্থীরা নিজ ব্যয়ে এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা ও জনসংযোগে অনাগ্রহী হবে। ফলে জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মাঝে সম্পর্কের ঘাটতি হবে এবং স্থানীয় উন্নয়নে ব্যাঘাত ঘটবে।

 

জবাব: এই পদ্ধতিতে দল এলাকা ভিত্তিক অধিক জনপ্রিয়, দেশপ্রেমিক ও দক্ষ লোকদেরকে বাছাই করে নির্বাচনী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে এবং তা জনগণের জন্য প্রকাশ করবে। দলের প্রকাশিত তালিকা হতে জনগণ তাদের এলাকার জনপ্রতিনিধি

 সম্পর্কে জানতে পারবেন। দলীয়ভাবে ঘোষিত প্রার্থীরা তাদের কর্মী-সমর্থক ও নেতৃবৃন্দদের নিয়ে গণসংযোগ করবেন। এভাবে জনগণ ও প্রার্থীর মধ্যে FPTP পদ্ধতির মতোই সম্পর্ক তৈরি হবে যা উক্ত এলাকার উন্নয়নে সহায়ক হবে। এ পদ্ধতিতে কালো টাকার প্রভাব, রাজনৈতিক হানাহানি, খুন, হামলা, মামলা, সহিংসতা ইত্যাদি হ্রাস পাবে।

 

সমালোচনা-৪ দলীয় কেন্দ্রীকরণ ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ব্যাঘাত: এতে দলীয় কেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং দলের ভিতরে

স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের চর্চা হ্রাস পাবে। ফলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ স্বৈরাচারী হতে পারে। দলীয় গণতন্ত্র ব্যাহত হবে। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা অবহেলিত হবে। ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হবে।

 

জবাব: এই পদ্ধতিতে দলীয় গণতন্ত্র আরো সুসংহত হবে। দল জনপ্রিয়, দেশপ্রেমিক ও দক্ষ প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য এলাকাভিত্তিক কাউন্সিল করবে। এতে স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা উজ্জীবিত হবে। দল সুসংগঠিত হবে। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার জন্য হানাহানি ও অন্তর্কোন্দল কমবে। স্থানীয় কমিটির উপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে সুষ্ঠ, সুন্দর ও শান্তিপ্রিয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অনেক দেশে এই তালিকা প্রণয়ন করার জন্য অভ্যন্তরীণ প্রাইমারি ভোট, সদস্যভিত্তিক নাম চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। যেমন সুইডেন ও জার্মানীতে পার্টি কনভেনশন, উপকমিটি বা কর্মী ভিত্তিক ভোটিংয়ের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থী বাছাই হয়।

 

সমালোচনা-৫ নিষিদ্ধ ও চরমপন্থী দলের উত্থান: এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন হলে অন্য কোন দলের সাথে আঁতাত করে চরমপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং নিষিদ্ধঘোষিত দল বা গোষ্ঠীরাও সংসদে আসন লাভ করতে পারবে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ঐক্যের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।

 

জবাব: চরমপন্থা, বিচ্ছিন্নতাবাদিতা ও নিষিদ্ধঘোষিত দল ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত মাধ্যম হলো তাদেরকে মূলধারার সাথে অন্তর্ভুক্তি। এতে তাদের উত্থানের আশঙ্কা থাকলেও উপযুক্ত ও কার্যকরী আইনী ব্যবস্থা ও ন্যূনতম ভোট সংখ্যার সীমা

(Threshold) থাকলে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেমন তুরস্কে ৭ শতাংশ ও জার্মানিতে ৫ শতাংশ সীমারেখা প্রচলিত আছে যা রাজনৈতিক বিভাজনরোধে কার্যকর। পিআর ব্যবস্থার মাধ্যমে চরমপন্থার বিপরীতে সহনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির বিকাশ ঘটে।

সমালোচনা-৬ স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনে বাধা: অনেকে মনে করেন, পিআর পদ্ধতিতে যেহেতু দল ভিত্তিক নির্বাচন হবে তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

 

জবাব: এই পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে দলীয় উন্মুক্ত তালিকার মতো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশনে নাম ও প্রার্থীতা জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটের সীমা (Threshold) অতিক্রম করলে সে প্রার্থী নির্বাচিত হবে। এই সকল বিষয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচনী আইন ও নির্বাচন কমিশন আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

উপসংহার: একটি সুশৃঙ্খল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য পিআর পদ্ধতি চালু করার দাবি নতুন কিছু নয়। কিছু রাজনৈতিক দল অনেক দিন ধরেই এই দাবি জানিয়ে আসছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ সালে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল নির্বাচন কমিশন। সেই আলোচনায় জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সহ কিছু দল এই পদ্ধতিতে নির্বাচন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের ডাকা সংলাপেও জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কেননা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা একটি অংশগ্রহণমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি গ্রহণ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদের এ বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, যাতে জাতীয় সংসদে সকল শ্রেণি, মত ও দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। জনগণের ভোটের ন্যায্য প্রতিফলন, ভোট অপচয়রোধ, স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার বিলোপ, রাজনৈতিক বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করার জন্য পিআর নির্বাচন পদ্ধতি একান্ত প্রয়োজন। আসুন আমরা সবাই মিলে নির্বাচনে পেশিশক্তি ও কালোটাকার কারসাজিরোধ করে চাঁদাবাজ-দখলদার মুক্ত জবাবদিহিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ সরকার গঠনের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলি।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ ও নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জীবনকথা, পাবনা।

(Proportional Representation-PR)
(Proportional Representation-PR)

What's New​

Follow Us On

Adv. Aminul Islam

Trending Now​

কক্সবাজার ভ্রমন

কিছুদিন আগেই কয়েকটা দিন কক্সবাজারে কাটিয়ে এলাম। প্রতিবারই মনে হয়—কক্সবাজার যেন নতুনভাবে নিজেকে...

চলনবিলের রূপবদল

🌿 চলনবিলের রূপবদল: বর্ষায় মাছ-নৌকা, শুষ্কে শরিষার সুবাস বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত...

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস...

যোগ্য নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি

যোগ্য নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি   একজন যোগ্য নেতা কেবল কোনো পদে অধিষ্ঠিত...

Recent Post​

কক্সবাজার ভ্রমন

কিছুদিন আগেই কয়েকটা দিন কক্সবাজারে কাটিয়ে এলাম। প্রতিবারই মনে হয়—কক্সবাজার যেন নতুনভাবে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই শহর শুধু সমুদ্র...

চলনবিলের রূপবদল

🌿 চলনবিলের রূপবদল: বর্ষায় মাছ-নৌকা, শুষ্কে শরিষার সুবাস বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত চলনবিল দেশের বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত। নাটোর, পাবনা...

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) নির্বাচন ব্যবস্থা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস     ভূমিকা: বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা...

যোগ্য নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি

যোগ্য নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি   একজন যোগ্য নেতা কেবল কোনো পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি নন, বরং তিনি এমন...

পাবনা জেলা: ভৌগলিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়

পাবনা জেলা: ভৌগলিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পাবনা জেলা বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। নদী, সেতু, ঐতিহাসিক স্থাপনা...

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভালো ও মন্দ দিক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: ভালো ও মন্দের পূর্ণ চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হলো এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে মানুষ...

ঐতিহ্য, উন্নয়ন, সমৃদ্ধির জনপদের নাম পাবনা

ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধশালী জেলার নাম পাবনা।  ...
Scroll to Top