ইতিকাফ : আল্লাহর নৈকট্যলাভের অনন্য মাধ্যম
ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
ইতিকাফ
ইতিকাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর ফযীলত ও মর্যাদা অতুলনীয়। এটি আল্লাহ তা‘য়ালার নৈকট্যলাভের অনন্য মাধ্যম। আল-কুরআন মাজীদে ইরশাদ করা হয়েছে- ‘আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে (বায়তুল্লাহকে) পবিত্র কর তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য।’ (সূরা আল-বাকারা: ১২৫)
উক্ত আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁর দুই জন নবীকে বায়তুল্লাহ পুন:নির্মাণের পর পরই ইতিকাফকারীদের জন্য তা পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর দ্বারাই মূলত ইতিকাফের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। এর ফযীলত সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে: ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্ল¬াহু আলাইহি ওয়াসাল¬øাম বলেছেন, ইতিকাফকারী সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং তার জন্য এত বেশি সওয়াব লিখিত হয় যেন সে সব ধরনের নেক কাজ রয়েছে।’ (মিশকাত) অন্য হাদীসে রয়েছে: ‘যে ব্যক্তি রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করল, সে যেন দুটি হজ্জ ও দুটি ওমরা আদায় করল।’ (বায়হাকী)
ইতিকাফের অর্থ: ইতিকাফের শাব্দিক অর্থ আবদ্ধ হওয়া, আটকা পড়া, থেমে যাওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ হলো-পার্থিব কাজ-কারবার ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করা বা অবস্থান করাকে বুঝানো হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন: নবী কারীম (সা.) প্রত্যেক রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এ আমল তাঁর ইন্তিকাল পর্যন্ত জারি থাকে। রাসূল (সা.) এর ইন্তিকালের পরে তাঁর স্ত্রীগণ রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। (বুখারী-মুসলিম) হজরত আনাস (রাঃ) বলেন, ‘নবী কারীম (সা.) রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। একবছর তিনি ইতিকাফ করতে পারেননি, তাই পরবর্তী বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেন।’ (তিরমিযী)
ইতিকাফ শ্রেষ্ঠ ইবাদত: ইতিকাফ একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত, এর মাধ্যমে আল্লাহর তা‘য়ালার সাথে নিবির সম্পর্ক স্থাপিত হয়, পার্থিব সকল কিছুর মায়াজাল ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর তা‘য়ালার ধ্যানেই নিজের অন্তরকে নিবিষ্ট করা হয়। ইতিকাফের মাধ্যমে সাংসারিক কর্মব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা উপেক্ষা করে নিজের চিন্তা, শক্তি, যোগ্যতা, চেষ্টা ও সময়কে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত করা যায়। আল্লাহর নৈকট্যলাভের এ প্রশিক্ষণ পরবর্তী জীবনে ইতিকাফকারীকে আল্লাহর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকতে ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত রাখতে সহায়তা করে। রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদয়ে কেফায়া। তাই এই সুন্নাত সজীব রাখার জন্য মহল্লার কিছু লোকের ইতিকাফের ব্যবস্থা করা সকল মুসলিমদের কর্তব্য। মহল্লার কেউই যদি ইতিকাফ না করে তবে সমগ্র মহল্লাবাসীই এ সুন্নাত তরকের জন্য গুনাহগার হবে। পুরুষের ইতিকাফের জন্য মসজিদ শর্ত হলেও মহিলারা তাদের ঘরের নির্জন স্থানে বসে ইতিকাফ করতে পারেন।
ইতিকাফের ফযিলত: ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ইতিকাফকারী সর্ব প্রকার পাপ হতে মুক্ত থাকে এবং অন্যরা বাইরে আমল করে যে নেকী লাভ করে সে ইতিকাফে থেকে বাইরের আমলগুলো না করেও সেই পরিমাণ নেকী লাভ করে। [ইবনে মাজাহ] ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত উক্ত হাদীসে ইতিকাফের দুটি বড় ফায়দার কথা বর্ণিত হয়েছে। যার একটি হলো যাবতীয় পাপ হতে মুক্ত থাকা। বাইরে থাকলে হয়তো বা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আশংকা ছিল; কিন্তু ইতিকাফের দরুন তা থেকে রক্ষা তো পেলই অধিকন্তু না করেও অনেক নেক আমল; যেমন জানাজায় শরীক হওয়া, রুগীর সেবা করা ইত্যাদির নেকী পেয়ে গেল। ইতিকাফ না করে বাইরে থাকলে হয়তো সে এই আমলগুলো নাও করতে পরতো, কিন্তু এখন ইতিকাফের বদৌলতে সেই আমলগুলোর সওয়াবও পেয়ে গেলো। অপর বর্ণনায় এসেছে, সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাঃ) মসজিদে নববীতে ইতিকাফ অবস্থায় ছিলেন। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি এসে তাঁকে সালাম দিয়ে চুপ করে বসে গেলেন। তাকে দেখে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, ব্যাপার কি? তোমাকে খুব বিষণœ ও চিন্তাকিøষ্ট মনে হচ্ছে। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের চাচাত ভাই! হাঁ, নিশ্চয় আমি চিন্তিত ও পেরেশান। কারণ জনৈক ব্যক্তির কাছে আমি ঋণী। এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রওজার দিকে ইশারা করে বললেন, ঐ কবর ওয়ালার ইজ্জতের শপথ, সেই ঋণ আদায়ের সামর্থ আমার নেই। এ কথা শুনে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমি কি তোমার জন্য তার কাছে (ঋণ দাতার নিকট) সুপারিশ করব? লোকটি বললেন, আপনি যা ভাল মনে করেন। এ কথা শুনে ইবনে আব্বাস (রাঃ) তৎক্ষণাত জুতা পরে মসজিদের বাহিরে এলেন। এটি দেখে লোকটি বললেন, আপনি হয়তো ইতিকাফের কথা ভুুলে গেছেন। তিনি বললেন, না; ভুলি নাই। (তখন তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল) বেশি দিনের কথা নয়, (মহানবী (সা.) এর রওজার দিকে ইশারা করে বললেন) আমি এই কবরওয়ালার নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজ মুসলিম ভাইয়ের কোন অভাব পুরণার্থে রওনা হয় এবং তাতে সে চেষ্টা করে, তা তার দশ বছর ইতিকাফ করার চেয়েও উত্তম হয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতিকাফ করে, আল্লাহ তা‘য়ালা তার ও জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন, যার দূরত¦ আকাশ ও জমীনের মধ্যবর্তী স্থান হতেও বেশি। [বায়হাকী]
ইতিকাফের গুরুত্ব: মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমাযান মাসে দশ দিন ইতিকাফ করবে, তার এই ইতিকাফ নেকী ও শ্রেষ্টত্বের বিবেচনায় দুটি হজ্জ ও দুটি ওমরার সমপর্যায়ের হবে। [বায়হাকী] অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ইতিকাফকারী প্রতিদিন একটি করে হজ্জের সওয়াব পায়। [বায়হাকী] এই বিশাল ফযীলত ও বরকতপর্ণ ইবাদত ইতিকাফের তাৎপর্য ও মর্মকথা হলো, অন্তরকে সকল কিছু থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সাথে জুড়ানো। দুনিয়ার সকল কর্ম ব্যস্ততা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র আল্লাহর জন্য ব্যস্ত হওয়া। পার্থিব সকল সর্ম্পক ছিন্ন করে কেবল মাত্র তাঁরই সাথে সর্ম্পক স্থাপন করা। শয়নে-স্বপনে শুধু তাঁরই যিকর-ফিকর ও মহব্বতে ডুবে থাকা। এভাবে ইতিকাফ করতে পারলে পওয়া যাবে ইতিকাফের প্রকৃত স্বাদ এবং সৃষ্টি হবে মহান প্রভুর সাথে গভীর ভালবাসা।
কদরের রজনী লাভ: ইতিকাফের সবচেয়ে বড় হিকমত ও উপকারিতা হলো, ইতিকাফ করলে শবে কদরের মত মহিমময় রাত পাওয়া যায়। কেননা হাদিসের ভাষ্য মতে শবে কদর রমাযানের শেষ দশকেই হয়। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রাসূল (সা.) রমাযান মাসের প্রথম দশকে ইতিকাফ করেন। অতপর দি¦তীয় দশকেও ইতিকাফ করেন। এরপর তুর্কী তাবু হতে মাথা মুবারক বের করে নবীজী বললেন, আমি কেবল কদরের তালাশেই প্রথম ও শেষ দশকে ইতিকাফ করেছিলাম। অনন্তর আমাকে বলা হলো, উহা রমাযানের শেষ দশকে। সুতরাং যে কেউ আমার সাথে ইতিকাফ করে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। উক্ত রাত আমাকে দেখানো হয়েছিল কিন্ত আমি তা ভুলে গিয়েছি। তবে তার আলামত এই যে, আমি আমাকে সেই রাতের সকালে পানি ও কাদা মাটির মধ্যে সিজদা করতে দেখেছি। কাজেই তোমরা শবে কদরকে রমাযানের শেষ দশকে তালাশ কর। [সহীহুল বুখারী] উক্ত হাদীসের ভাষ্য মতে, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে হয়। আর ইতিকাফও শেষ দশকেই করা হয়, তাই ইতিকাফকারীর শবে কদর পাওয়াটা অনেকটাই নিশ্চত হয়ে যায়।
আল্লাহর নৈকট্যলাভ: ইতিকাফের নিয়তে আল্লাহর ঘর মসজিদে প্রবেশ করলে আল্লাহর বান্দা আল্লাহর সরাসরি হিফাযতে চলে আসেন। ফলে সে ভয়ংকর শত্রু শয়তানের চক্রান্ত ও ক্ষতি থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। ইতিকাফে বসলে বাহিরের গুনাহগুলো হতে নিরাপদ থাকা যায়। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে- ‘আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, যে ব্যক্তি আমার অর্ধ হাত নিকটে আসে আমি তার এক হাত নিকটবর্তী হই, আর যে আমার এক হাত নিকটবর্তী হয় আমি তার দুই হাত নিকটবর্তী হই, আর যে আমার দিকে হেটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ ইতিকাফকরী শুধু আল্লাহর নিকটবতীই হয় না; বরং সে বাড়ি-ঘর ছেড়ে আল্লাহর দরবারে এসে হাজির হয়। সে অপেক্ষায় থাকে আল্লাহর রহমত পাওয়ার জন্য। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ নামাযের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ নামাযের সওয়াব পেতে থাকে।’ [বুখারী ও মুসলিম]
সমাপনী: ইবনে কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘ইতিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মহান আল্লাহর সঙ্গে আত্মার সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। সব ব্যস্ততামুক্ত হয়ে আল্লাহর ধ্যান মগ্ন হওয়া। পার্থিব সব ধরনের সংশ্রব ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর সান্নিধ্যে এসে তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা।’ অফুরান সওয়াব অবারিত রহমত লাভের সুবর্ণ সুযোগটি আমাদেরও কাজে লাগানো দরকার। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে ইতিকাফের মাধ্যমে সকল কিছুর মায়াজাল ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় নিজের অন্তরকে নিবিষ্ট করার এবং সাংসারিক কর্মব্যস্ততা ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা উপেক্ষা করে নিজের চিন্তা, শক্তি, যোগ্যতা, চেষ্টা ও সময়কে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নিয়োজিত করে মহান আল্লাহর তা‘য়ালার নৈকট্যলাভ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাঁথিয়া, পাবনা।