![]()
চলনবিলের মানুষ : জলমাখা জীবনের কাব্য

ভোরের আলো ফুঁড়ে উঠে সূর্য যখন চলনবিলের জলে ঝলমল করে, জেগে উঠে চলনবিলের মানুষের জীবনের গল্প তখনই জেগে ওঠে চারপাশের গ্রাম। পাখির কূজন আর জেলের বৈঠার শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তোলে। নৌকার হাল ধরা জেলের চোখে তখন কেবল মাছ ধরার আশায় ভরা সকাল, আর কৃষকের মনে জমে ওঠে মাঠের ধান রোপণের স্বপ্ন।
চলনবিলের মানুষরা প্রকৃতির সন্তান। বর্ষায় যখন চারপাশের মাঠ-ঘাট ভরে যায় জলে, তখন গ্রাম যেন ভাসমান দ্বীপে পরিণত হয়। স্কুলে যাওয়া শিশুদের হাতে বইয়ের থলে, আর পায়ের নিচে ছোট্ট নৌকার তক্তা। বাজার বসে ভাসমান দোকানে, সবজি আর মাছের হাঁকডাক মিলিয়ে যায় পানির ঢেউয়ে।
বর্ষার দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় ভরসা—মাছ। কেউ ভোরে জাল ফেলছে, কেউ দুপুরে খেপলা টানছে, আবার কেউ সন্ধ্যায় মশারি জাল দিয়ে টোপ দিচ্ছে। সেই মাছই রান্না হয় পরিবারের হাঁড়িতে, সেই মাছই বিক্রি হয় হাটে, আর সেই মাছ দিয়েই মেটে সংসারের অন্ন।
বর্ষাকাল বিদায়ের পরই আশে বিশাল বৈচেত্র নিয়ে নাতুন পরিবেশ। এঅঞ্চেলে কৃষকরা বিলের পানি ধৌত পলিমাটির স্তর পরা জমিতে সরিষার আবাদ হয়। একটা সময় পুরো চলনবিল জুরে দেখা যায় শুধু শরিষা ফুলের দৃশ্য। সে এক অপরুপ হলূদ ফুলের বিস্তৃর্ণ বাগান।
কিন্তু শীত এলে ছবি বদলে যায়। পানি সরে গেলে উন্মুক্ত হয় উর্বর জমি। তখন চলনবিলের মানুষরা আবার কৃষক রূপে মাঠে নামে। ধানের শিষ দোলে, গরু-বাছুর চরতে থাকে মাঠে, কৃষাণ-কৃষাণীরা মিলে ধান কাটার গান গায়—
“ধান কাটনির টান, খড়ের গাদার গান”।
সেই সুরে ভরে ওঠে গ্রামবাংলার সন্ধ্যা।
তবে সবটা শুধু আনন্দ নয়। বর্ষার অতিরিক্ত পানি কখনো ঘরবাড়ি ভাসিয়ে দেয়, আবার খরার দিনে ফসল পুড়ে যায় তাপে। জলাবদ্ধতা আর রোগব্যাধি তাদের জীবনে আনে দুঃখের ছায়া। তবুও তারা হার মানে না—প্রকৃতিকে সাথী করে নতুনভাবে শুরু করে প্রতিদিন।
চলনবিলের মানুষরা যেন শিখিয়েছে, জীবন মানে শুধু সংগ্রাম নয়—এটা এক ধৈর্য, আশা আর প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকার শিল্প।
তাদের হাসি, তাদের গান, তাদের ভাসমান ঘরবাড়ি সবকিছুই সাক্ষ্য দেয় এক জলমাখা জীবনের কাব্যের।