তালাক ও তালাক-পরবর্তী আইনগত বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা
বৈবাহি সম্পর্কের সমাপ্তি
বাংলাদেশে মুসলিমদের তালাক বিষয়টি প্রধানত “Muslim Family Laws Ordinance, 1961” (MFLO 1961) এবং Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974 দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
বাংলাদেশে তালাক কার্যকর করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া অবশ্যই মেনে চলতে হয়।
তালাক ও তালাক-পরবর্তী আইনগত প্রতিকার,তালাক শব্দের অর্থ হলো বিচ্ছেদ বা আলাদা করা। ইসলামী শরীয়ত ও বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তালাক হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের সমাপ্তি। তবে তালাক শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সামাজিক ও আইনগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তালাকের মাধ্যমে যেমন দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে, তেমনি এর পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের অধিকার, দায়িত্ব ও প্রতিকারের বিষয়ও নির্ধারিত থাকে।
তালাকের ধরন
বাংলাদেশে মুসলিম পরিবার আইন অনুসারে তালাক সাধারণত তিন প্রকারে হয়ে থাকে—
১. তালাক-ই-সুন্নাত – স্বাভাবিক ও শরীয়তসম্মত তালাক (একবারে তিন তালাক না দিয়ে নির্দিষ্ট সময় ও নিয়ম মেনে তালাক দেওয়া)।
২. তালাক-ই-বিদআত – একসাথে তিন তালাক উচ্চারণ করা, যা ইসলামি দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় হলেও আইনগতভাবে কার্যকর।
৩. তালাক-ই-তাফউইজ – স্ত্রীকে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা।
বাংলাদেশে তালাক প্রদানের আইনগত প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের মুসলিম পরিবার আইন, ১৯৬১ অনুসারে তালাক কার্যকর করতে হলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়—
তালাক প্রদানের প্রক্রিয়া (ধারা-৭, MFLO 1961)
১. ধারা ৭(১): তালাক দিতে হলে স্বামীকে লিখিতভাবে (তালাকনামা) স্বাক্ষর করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান / পৌরসভা মেয়র / সিটি কর্পোরেশন মেয়র) এর কাছে নোটিশ পাঠাতে হবে।
২. ধারা ৭(২) ধারা মোতাবেক একই সঙ্গে স্ত্রীকেও একটি কপি সরবরাহ করতে হবে।
৩. ধারা ৭(৩): নোটিশ দেওয়ার ৯০ দিন পর, অথবা স্ত্রী গর্ভবতী হলে প্রসব পর্যন্ত, তালাক কার্যকর হবে।
৪. ধারা ৭(৪): নোটিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারম্যান একটি সালিশি পরিষদ গঠন করবেন এবং পুনর্মিলনের চেষ্টা করবেন।
এই ধারা অনুযায়ী নোটিশ না দিলে তালাক আইনত কার্যকর হয় না।
দেনমোহর সম্পর্কিত আইন
Muslim Family Laws Ordinance, 1961 এর ধারা ১০ অনুযায়ী, দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার। তালাক ঘটলে অবিলম্বে দেনমোহরের পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশে দেনমোহর আদায়ের জন্য স্ত্রী ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করতে পারেন।
খোরপোষ (Maintenance) ও ইদ্দত
১. MFLO 1961, ধারা ৯:
স্ত্রী ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী।
২. Muslim Family Courts Ordinance, 1985:
স্ত্রী ও সন্তান উভয়ের ভরণপোষণ দাবি করার জন্য ফ্যামিলি কোর্টে মামলা করা যায়।
৩. Guardians and Wards Act, 1890 অনুসারে, সন্তানের হেফাজত সাধারণত মায়ের হাতে থাকে, তবে আর্থিক দায়িত্ব পিতার ওপর বর্তায়।
এই আইনি প্রক্রিয়া না মানলে তালাক আইনত কার্যকর হয় না।
তালাক-পরবর্তী আইনগত প্রতিকার
তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী ও সন্তানদের স্বার্থ রক্ষার্থে বিভিন্ন আইনগত প্রতিকার পাওয়া যায়—
১. মোহরানা (দেনমোহর): স্ত্রী তার নির্ধারিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা দাবি করতে পারবেন। তালাক হলে দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর বাধ্যবাধকতা।
২. খোরপোষ (Maintenance): স্ত্রী ইদ্দতকালে (তালাকের পর প্রায় তিন মাস বা প্রসূতির ক্ষেত্রে সন্তান জন্ম পর্যন্ত) ভরণ-পোষণের অধিকারী।
সন্তানের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী পিতার ওপর বর্তায়।
৩. স্ত্রীর সম্পত্তির অধিকার: স্বামীর বাড়ি বা সম্পত্তিতে স্ত্রী তালাকের পর আর মালিকানা দাবি করতে পারবেন না, তবে দেনমোহর ও অন্যান্য পাওনা তিনি আইনগতভাবে আদায় করতে পারবেন।
৪. তালাকের নিবন্ধন ও সনদ: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে তালাকের সনদ গ্রহণ করে আইনি প্রমাণ নিশ্চিত করতে হয়।
৫. অভিভাবকত্ব (Guardianship): সন্তানের হেফাজতের ব্যাপারে আদালত সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণের দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণত অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অভিভাবকত্ব মায়ের কাছে থাকে, তবে অর্থনৈতিক দায়িত্ব পিতার।
সামাজিক দায়িত্ব ও সচেতনতা
তালাক একটি বৈধ ব্যবস্থা হলেও তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য—
পারিবারিক সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক বোঝাপড়া, আলোচনা ও মীমাংসার চেষ্টা করা জরুরি।
তালাকের আগে সালিশ বা পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
আইনগত প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা থাকা নারীর অধিকার সুরক্ষায় সহায়ক।
উপসংহার
তালাক কখনো কাম্য নয়, তবে অনিবার্য পরিস্থিতিতে এটি বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির একমাত্র বৈধ উপায়। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন তালাক ও তালাক-পরবর্তী সময়ে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্বকে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে। তাই তালাক প্রদান বা গ্রহণের সময় যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং পরবর্তী প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। সচেতনতা ও ন্যায্যতার মাধ্যমেই তালাক-পরবর্তী জীবনে একটি সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব। ইসলামী শরীয়তে তালাক বৈধ হলেও এটি শেষ অবলম্বন হিসেবে গণ্য।