![]()
জমি কেনার পূর্বে ক্রেতা ও বিক্রেতার করণীয়
ক্রেতা ও বিক্রেতার ১০টি আবশ্যকীয় করণীয়
বাংলাদেশে জমি কেনাবেচা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল প্রক্রিয়া। সঠিক আইনের প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে যাচাই না করলে পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
একটি নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত জমি কেনাবেচার জন্য ক্রেতা এবং বিক্রেতা—উভয় পক্ষেরই কিছু নির্দিষ্ট আইনি ও ব্যবহারিক দায়িত্ব রয়েছে।
নিচে জমি ক্রয়ের পূর্বে বিক্রেতা ও ক্রেতার জন্য ১০টি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক্রেতার জন্য করণীয় (৫টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
১. মালিকানা ও মূল দলিল যাচাই (Search of Title Deed)
জমি কেনার প্রথম কাজ হলো বিক্রেতার কাছে মূল দলিল (Original Sale Deed) চাওয়া।
বিক্রেতা যদি জমিটি ক্রয়সূত্রে পেয়ে থাকেন, তবে তার নামে নিবন্ধিত মূল দলিলটি দেখতে হবে।
জমিটি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত (বাওয়া) হয়, তবে বন্টননামা দলিল (Partition Deed) ও ওয়ারিশান সনদপত্র যাচাই করতে হবে।
১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন (Transfer of Property Act, 1882) অনুযায়ী, বিক্রেতার যদি জমিতে বৈধ এবং নিষ্কণ্টক স্বত্ব না থাকে, তবে তিনি তা বিক্রি করার অধিকারী নন।
২. নামজারি বা মিউটেশন এবং খতিয়ান পরীক্ষা
শুধু মূল দলিল থাকলেই জমাক্রান্তি শেষ হয় না। ক্রেতাকে অবশ্যই জমির সর্বাধুনিক ‘নামজারি’ (Mutation) বা খতিয়ান যাচাই করতে হবে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নামজারি ডিসিআর (DCR) এবং নামজারি খতিয়ান পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে বিক্রেতার নামে জমিটির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে কিনা।
এছাড়া সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস খতিয়ানের ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে।
৩. খাজনা/ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান রশিদ যাচাই
জমির ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) হালনাগাদ পরিশোধ করা আছে কিনা তা দেখা অত্যন্ত জরুরি।
সর্বশেষ বছরের হাল সন পর্যন্ত খাজনা পরিশোধের রশিদ বা ‘দাখিলা’ বিক্রেতার কাছ থেকে চেয়ে নিতে হবে।
খাজনা বকেয়া থাকলে জমি রেজিস্ট্রির পর বকেয়া খাজনার দায়ভার নতুন ক্রেতার ওপর এসে পড়ে।
বিস্তারিত আরো জানতে পড়ুন
৪. জমির সরজমিন পরিদর্শন ও সীমানা নির্ধারণ
কাগজপত্র সঠিক থাকলেও জমি সরজমিনে গিয়ে দেখা অপরিহার্য।
জমিতে বিক্রেতার প্রত্যক্ষ দখল (Physical Possession) আছে কিনা তা দেখতে হবে।
আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা মেপে দেখতে হবে দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণের সাথে বাস্তবের জমির মিল রয়েছে কিনা।
পার্শ্ববর্তী জমির মালিক ও প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে জানতে হবে জমিটি নিয়ে কোনো সামাজিক বা আইনি বিরোধ চলছে কিনা।
আপনার সন্তানকে দলিল পড়তে দিন
৫. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এনকামব্রেন্স (দায়বদ্ধতা) অনুসন্ধান
জমিটি কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা তৃতীয় কারও কাছে বন্ধক (Mortgage) রাখা আছে কিনা, অথবা এটি নিয়ে আদালতে কোনো মামলা বা নিষেধাজ্ঞা (Injunction) রয়েছে কিনা তা যাচাই করা প্রয়োজন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ১২ নং ফরমের মাধ্যমে তল্লাশি (Search) দিয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে জমিটি নিষ্কণ্টক এবং বিক্রয়ের জন্য মুক্ত।
বিক্রেতার জন্য করণীয় (৫টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ)
৬. হালনাগাদ স্বত্ব ও নথিপত্র প্রস্তুত রাখা
বিক্রেতার প্রথম দায়িত্ব হলো ক্রেতাকে জমি বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সব নথি সঠিকভাবে সরবরাহ করা।
মূল দলিল, পূর্ববর্তী বায়না দলিল (যদি থাকে), ওয়ারিশান সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং খাজনা পরিশোধের সর্বশেষ রসিদ প্রস্তুত রাখতে হবে।
কাগজপত্রে কোনো ভুলত্রুটি বা নামের বানান অমিল থাকলে তা আগেই সংশোধন (Rectification) করে নেওয়া উচিত।
৭. নামজারি ও খতিয়ান হালনাগাদ করা
নিজের নামে নামজারি বা মিউটেশন না থাকলে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া আইনি জটিলাতায় পড়ে।
১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের (Registration Act, 1908) সংশোধন (ধারা ৫২এ) অনুযায়ী, নামজারি ব্যতীত ও বিক্রেতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান না থাকলে জমি রেজিস্ট্রি করা যায় না। তাই জমি বিক্রির পূর্বেই এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নিজের নামে মিউটেশন সম্পন্ন করে রাখা আবশ্যক।
৮. বাস্তব দখল হস্তান্তর নিশ্চিতকরণ
বিক্রেতাকে নিশ্চিত করতে হবে যে বিক্রয়যোগ্য জমিটি সম্পূর্ণ বিরোধমুক্ত এবং জমিটির বাস্তব দখল তার নিজের অধীনে রয়েছে।
জমিতে যদি কোনো বর্গাচাষী, ভাড়াটিয়া বা অবৈধ দখলদার থাকে, তবে তা বিক্রির আগেই মীমাংসা করতে হবে।
জমি বিক্রির পর ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সীমানা চিহ্নিত (Pillaring) করে দেওয়া বিক্রেতার নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
৯. যৌথ বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সম্মতি গ্রহণ
যদি জমিটি যৌথ মালিকানাধীন (Co-ownership) হয় বা শরিকি সম্পত্তি হয়:
বিক্রির পূর্বে অন্য শরিকদের সাথে কথা বলে তাদের মত বা লিখিত সম্মতি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
শরিকদের অগ্রক্রয়াধিকার (Pre-emption) আইনি স্বত্ব থাকে, তাই তাদের অবহেলা করে জমি বিক্রি করলে পরবর্তীতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই মামলায় পড়তে হতে পারে।